হোম জাতীয় ২০১৯-এ শিশু ধর্ষণ হাজার অতিক্রম

২০১৯-এ শিশু ধর্ষণ হাজার অতিক্রম

7
২০১৯-এ শিশু ধর্ষণ হাজার অতিক্রম
বাংলাদেশে শিশু অধিকার পরিস্থিতি-২০১৯ পেশ (ছবি : সংগৃহীত)

বিটিএন২৪ রিপোর্ট: ২০১৯ সালে এক হাজার অতিক্রম করেছে শিশু ধর্ষণের সংখ্যা। আর প্রতিমাসে গড়ে প্রায় ৮৪টি শিশু ধর্ষিত হচ্ছে। সার্বিক শিশু নির্যাতন কিছুটা কমলেও শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন বেড়েছে আশঙ্কাজনক মাত্রায়। এমন তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম।

বুধবার (৮ জানুয়ারি) রাজধানীর ডিআরইয়ের সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে শিশু অধিকার পরিস্থিতি ২০১৯’ প্রকাশ বিষয়ক প্রেস ব্রিফিং এসব তথ্য জানায় সংগঠনটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, শিশু অধিকার পরিস্থিতি ২০১৯ (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) সময়ে ১৫টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সংবাদ পর্যালোচনায় ৪ হাজার ৩৮১টি শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। যাদের মধ্যে ২ হাজার ৮৮ শিশু অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে এবং ১ হাজার ৩৮৩টি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিমাসে ৩৬৫টি শিশু বিভিন্ন রকমের সহিংসতার শিকার হয়েছে। 

বিএসএএফ ৬টি ক্যাটাগরিতে শিশু নির্যাতনের তথ্যের বিশ্লেষণ করে থাকে। যার প্রায় সবকটিতেই ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা কমলেও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা। তবে ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে শিশুদের প্রতি সহিংসতার হার কমেছে ৩৪.৭৪%। 

সংগঠনটির নিজস্ব পর্যালোচনা মোতাবেক, ২০১৯ সালে অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে ২ হাজার ৮৮টি শিশু, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ১১.৩০ শতাংশ কম। ২০১৯ সালে গড়ে প্রতিমাসে ১৭৪ শিশু অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৫৫, পানিতে ডুবে ৫০৭ এবং হত্যায় ৪৪৮ শিশু নিহত হয়েছে। এই ৩টি ঘটনায় গড়ে প্রতি মাসে যথাক্রমে ৪৬টি, ৪২টি এবং ৩৭টি শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

২০১৯ সালে শিশু হত্যা বেড়েছে ৭.১৮ শতাংশ এবং গড়ে প্রতি মাসে অন্তত ৩৭টি শিশু খুন হয়েছে। তথ্য পর্যবেক্ষণে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তুচ্ছ ঘটনায়, পারিবারিক সহিংসতায়, দাম্পত্য কলহ, যৌতুক, পরকীয়া এবং শত্রুতা-প্রতিশোধের বলি হয়েছে নিরীহ শিশু। এ ছাড়াও দরিদ্র শ্রমজীবী শিশুদের তুচ্ছ কারণে বা চুরির অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে নির্যাতন করে মেরে ফেলা ও শিশুকে বিষ খাইয়ে বা গলায় ফাঁস দিয়ে খুন করে বাবা-মায়ের আত্মহত্যার বেশ কিছু ঘটনাও ঘটেছে।

উদ্বেগ প্রকাশ করে সংগঠনটি জানায়, বিগত ৫ বছরের মধ্যে ২০১৯ সালেই শিশু খুনের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০১৯ সালে যেখানে ৪৪৮টি শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, সেখানে ২০১৮ সালে ৪১৮টি, ২০১৭ সালে ৩৩৯টি, ২০১৬ সালে ২৬৫টি এবং ২০১৫ সালে ২৯২টি শিশু খুন হয়েছে। অর্থাৎ এই ৫ বছরে মোট ১৭৬২টি শিশুকে খুন করা হয়েছে। তার বিপরীতে মাত্র ১৬৮ শিশু হত্যা মামলার রায়ের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে।  

তবে ২০১৯ সালে শিশুদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা হার কমেছে ৪৬.৯৮ ভাগ। শিশুদের আত্মহত্যার কারণগুলো মূলত পারিবারিক কলহ, অভিমান, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া বা পিতা-মাতার প্রত্যাশিত ফল লাভে ব্যর্থ হওয়া, বাল্য বিবাহ, যৌন নির্যাতন-নিপীড়নের ও পর্নোগ্রাফির শিকার হওয়া, সাইবার বুলিং, প্রেম-ভালোবাসায় ব্যর্থ বা প্রত্যাখ্যাত হওয়া এবং কোনো সৌখিন জিনিস চেয়ে না পাওয়া ইত্যাদি। 

বছরটিতে সবচেয়ে বেশি শিশু অপমৃত্যুর শিকার হয় সড়ক দুর্ঘটনার কারণে। যদিও ২০১৮ সালের  তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যু ১১.৪৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মোট অপমৃত্যুর শিকার হওয়া শিশুর ২৬.৫৮ ভাগ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। সড়কে অব্যবস্থাপনা, চালকের অবহেলা এবং মা-বাবা ও সাধারণভাবে জনগণের সচেতনতার অভাবও সড়কে শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম।  

বিগত বছরের তুলনায় বছরটিতে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার কমেছে ১৬.৩৪ শতাংশ। পর্যালোচনা করে দেখা গিয়েছে যে, বর্ষাকালে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর প্রবণতা অত্যাধিক বৃদ্ধি পায়। ২০১৯ সালের জুন থেকে আগস্ট মাসে ২৫২টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। যা কিনা ২০১৮ সালে পানিতে ডুবে মোট নিহত শিশুর প্রায় ৫০ শতাংশ। 

২০১৯ সালে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের চিত্র ছিল ভয়াবহ। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে শিশু যৌন নির্যাতন বেড়েছে ৭০.৩২ শতাংশ। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩টি শিশু বিভিন্ন ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালে যেখানে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল ৫৭১টি শিশু সেখানে ২০১৯ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫টি শিশু। প্রতিমাসে শিশু ধর্ষণের গড় ৮৩.৭৫। 

২০১৯ সালে শিশু ধর্ষণের মাত্রা ছিল পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে আশঙ্কাজনক ও ভয়াবহ। বিগত বছরগুলোর মধ্যে ২০১৯ সালেই সবচাইতে বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে । যদিও মেয়ে শিশু ধর্ষণের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়ে থাকলেও এই বছর ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনাও আমরা অনেক বেশি লক্ষ করেছি । 

২০১৯ সালে অপহরণ এবং নিখোঁজ হয়েছিল ৩৭৪টি শিশু। এর মধ্যে ১৮৭টি শিশু অপহরণ হয়। অপহৃত এই সব শিশুদের মধ্যে পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় ৯৮টি শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ২৯টি শিশু অপহরণের পরে খুনের শিকার হয়। এ দিকে নিখোঁজ মোট ১৩০টি শিশুর মধ্যে ৩৭টি শিশু জীবিত উদ্ধার হয় এবং ৬৬টি শিশু নিখোঁজের পর নিহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এছাড়া অপহরণের চেষ্টাকালে প্রতিহত করা হয়েছে ২৮টি শিশুকে, নবজাতক শিশু চুরি হয়েছে ৭টি, শিশু বিক্রির ঘটনা ঘটেছে ৬টি এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় নবজাতক শিশু উদ্ধার হয়েছে ১৬টি।

২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে সব ধরনের শারীরিক নির্যাতন এবং সহিংসতা কমেছে ৩.৩২%। ২০১৯ সালে ২১৯টি শিশু বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। অপঘাতে শিশু আহত হওয়ার ঘটনা কমেছে ৫৮.০১%। গত ৫ বছরে মোট ১৫৯৪টি শিশু বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় আহত হয়। ২০১৯ সালে ১৭৩টি, ২০১৮ সালে ৪১২টি, ২০১৭ সালে ২৪৯টি, ২০১৬ সালে ১৬৯টি এবং ২০১৫ সালে ৫৯১টি শিশু অপঘাতের শিকার হয়।

২০১৯ সালে ১৪৪টি শিশুকে বাল্যবিবাহের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। যার মধ্যে বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে ১৮টি শিশু এবং বাল্যবিবাহ থেকে সরকারের দ্রুত তৎপরতার কারণে উদ্ধার করা হয়েছে ১২৬টি শিশুকে। ২০১৮ সালের তুলনায় বাল্যবিবাহজনিত ঘটনা কমেছে ৩০.৭৭ শতাংশ।

শিশু নির্যাতন বন্ধে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করে একটি শিশুবান্ধব সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছে সংগঠনটি।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুছ সহিদ মাহমুদের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম, ইউএনডিপির হিউম্যান রাইটস প্রোগ্রামের চিফ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার শরমিলা রাসুল এবং টেরে ডেস হোমস নেদারল্যান্ডসের কান্ট্রি ডিরেক্টর মাহমুদুল কবীর ‍উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) শিশুদের নিয়ে কাজ করে সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত এমন ২৭২টি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের (এনজিও) একটি সমন্বিত জাতীয় নেটওয়ার্ক। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশে শিশু অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।