হোম আন্তর্জাতিক রাখাইনে গণহত্যার আলামত খুঁজে পায়নি মিয়ানমারের তথাকথিত কমিশন

রাখাইনে গণহত্যার আলামত খুঁজে পায়নি মিয়ানমারের তথাকথিত কমিশন

18
0
রাখাইনে গণহত্যার আলামত খুঁজে পায়নি মিয়ানমারের কমিশন

বিটিএন২৪ রিপোর্ট: মিয়ানমারের রাখাইনে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে মিয়ানমারের তথাকথিত ‘স্বাধীন কমিশন’। তবে কমিশন এ-ও বলেছে, সেখানে কোনো ধরনের গণহত্যার আলামত পাওয়া যায়নি। অবশ্য জাতিসংঘের নিরপেক্ষ সত্যানুসন্ধানী দল বলেছিল, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযানের উদ্দেশ্যই ছিল গণহত্যা। এ জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেখানে রোহিঙ্গাদের নির্বিচার হত্যা ও ধর্ষণ করেছিল।

ইনডিপেনডেন্ট কমিশন অব ইনকোয়ারি (আইসিওই) নামে কমিশন গঠন করেছিল দেশটির বর্তমান সরকারই। এই কমিশন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও সরকারের ঘনিষ্ঠ বলেও অভিযোগ আছে।

আইসিওই গতকাল দেশটির প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টের হাতে একটি প্রতিবেদন তুলে দিয়েছে। সেই প্রতিবেদন ধরে দেশটির দৈনিক পত্রিকা মিয়ানমার টাইমস-এর অনলাইন সংস্করণে বলা হয়, আইসিওই বিবৃতিতে বলেছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট এবং ৫ সেপ্টেম্বর রাখাইনে যে অভিযান চালানো হয়েছিল, তাতে আইন ভঙ্গ করা হয়েছে। ওই অভিযানে ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কিছু চৌকিতে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) হামলা চালায়। এই হামলার পর রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে শুরু হয় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তাণ্ডব। প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া রোহিঙ্গাদের ঢল শুরু হয় বাংলাদেশে। এই অভিযান শুরুর পর প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। কিন্তু এখন আইসিওই বলছে, সেখানে এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি, যার মাধ্যমে বলা যাবে যে রাখাইনে গণহত্যার মতো কোনো ঘটনা ঘটেছে।

কমিশনের এই প্রতিবেদন নিয়ে মিয়ানমারেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মিয়ানমার সরকার ও বেসরকারি মালিকানায় গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন এন্টারপ্রাইজ ফর হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্স, রিসেটেলমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইন রাখাইনের (ইউইএইচআরডি) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই প্রতিবেদন নিরপেক্ষ।

মিয়ানমারের আরাকান ন্যাশনাল পার্টির সেক্রেটারি খিনে পি সোয়ে বলেন, কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনে যুদ্ধাপরাধ করেছে সেনাবাহিনী। কিন্তু আগের কমিশন বা কমিটি সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধ নিয়ে কথা বলার সাহস পায়নি।

প্রতিবেদন প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে গাম্বিয়ার করা মামলায় আইসিজে যে রায় দিতে যাচ্ছেন, সেই রায়কে প্রভাবিত করতে পারবে এই প্রতিবেদন। তিনি বলেন, মিয়ানমারের উচিত বার্মিজ ও ইংরেজি—এই দুই ভাষাতেই প্রতিবেদনটি দ্রুত প্রকাশ করা, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানতে পারে এই কমিশন কীভাবে কাজ করেছে, তারা কী কী খুঁজে পেয়েছে এবং তারা কেন এই উপসংহারে পৌঁছাল।

ফিল রবার্টসন বলেন, পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ নিয়ে মন্তব্য করা উচিত নয়। তবে মিয়ানমার সরকারের ঘনিষ্ঠ এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এই কমিশন অস্বচ্ছ তদন্ত করে একটি বিবৃতি দিয়েছে। এই বিবৃতিতে যেসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা খানিকটা প্রত্যাশিতই ছিল বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

আইসিওইর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে রাখাইনে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল। এই অভিযানের মধ্যে ভয়ংকর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। অভিযানে সেনাবাহিনী ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন বাহিনী জড়িত ছিল। এই অভিযানে নিরপরাধ গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর এমন পদক্ষেপ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কমিশন এসব তথ্য উল্লেখ ৩১টি সংযুক্তিসহ ৪৬১ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন দিয়েছে।

রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্ত করতে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে এই কমিশন গঠন করেছিল মিয়ানমার সরকার। কমিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফিলিপাইনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোজারিও মানালো। গতকাল প্রেসিডেন্ট মিন্টের হাতে প্রতিবেদন তুলে দেওয়ার পর স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি।

কমিশনের অন্য তিন সদস্য হলেন জাতিসংঘে জাপানের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি কেনজো ওশিমা, মিয়ানমারের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান মিয়া থেইন ও ইউনিসেফের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অন তুন থেট।