হোম বিভাগীয় মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দিতে গিয়ে ফেরত আসল পুলিশ বাহিনী

মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দিতে গিয়ে ফেরত আসল পুলিশ বাহিনী

12
0
মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দিতে গিয়ে ফেরত আসল পুলিশ বাহিনী

বিটিএন২৪ বিভাগীয় প্রতিনিধি: শেষ বিদায়ের সময় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা (গার্ড অব অনার) ছাড়াই জানাজা শেষে দিনাজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনকে সমাহিত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১১টার দিকে সদর উপজেলার ৬ নম্বর আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ী গ্রামে জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়। একই সময় তাকে গার্ড অব অনার জানাতে জানাজার পূর্ব মুহূর্তে ম্যাজিস্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের একটি চৌকস দল গিয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের মরদেহটিও জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত করতে পারেননি তারা।

মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা আগে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি বরাবরে একটি চিঠি লেখায় গার্ড অব অনার জানাতে গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছে ওই দলটিকে।

জানা গেছে, মৃত্যুর ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন নিজে সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি বরাবরে প্রেরিত ওই চিঠিতে লিখেছিলেন- ‘আমার বয়স প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি। ছেলেটি হঠাৎ করে চাকরিচ্যুত হওয়ায় একেই তো আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ তারপর মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছি। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, তবে আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসিসহ যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত ও বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে। তাদের সালাম-স্যালুট শেষযাত্রার কফিনে আমি চাই না। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করিও।’

এই চিঠির প্রেক্ষিতেই ওসিয়ত অনুযায়ী বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা (গার্ড অব অনার) ছাড়াই তার দাফন সম্পন্ন করা হয়। 

মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন পিতৃস্নেহে এই চিঠিটি লিখে গেছেন। যার মূল কথা হলো- জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সুপারিশে ‘নো ওয়ার্ক নো পে’-এর ভিক্তিতে গাড়িচালক হিসাবে তার ছেলে নুর ইসলামের চাকরি হয়। সেই সুবাদেই দিনাজপুর সদর এসিল্যান্ডের গাড়ি চালাতেন তার ছেলে নুর ইসলাম। পরবর্তীতে এ কর্মস্থলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নূর ইসলাম। এ সময় তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে সেখানে উপস্থিত এডিসিকে (রাজস্ব) বিষয়টি দেখতে বলেন।

হুইপকে বিষয়টি অবগত করায় প্রশাসন থেকে প্রথমে নূর ইসলামকে তার বসবাসরত খাস পরিত্যক্ত বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এ্যাসিল্যান্ডের স্ত্রী নূর ইসলামকে বাথরুম পরিষ্কার ও মাংস রান্না করতে বলেন। এ সময় মাংস রান্না ঠিক না হওয়াসহ নানা অজুহাতে নূর ইসলামকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়।

এ দিকে, বিষয়টিতে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকারিয়াকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে যায় নূর ইসলাম। এতে জেলা প্রশাসকও ক্ষিপ্ত হয়ে যান। পাশাপাশি নুর ইসলাম তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাফ চাওয়ার জন্য এসিল্যান্ডের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যায়। এ সময় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তার সঙ্গে দেখা করতে পারেনি তারা। 

এরপর চাকরি চলে যাওয়ায় কোনো উপায় না পেয়ে পুনরায় হুইপ ইকবালুর রহিমের সঙ্গে দেখা করেন নুর ইসলাম। কিন্তু সেটিও প্রশাসন নেগেটিভ ভাবে নেয়। ফলে বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের ছেলে নূর ইসলাম চাকরিচ্যুত ও বাস্তচ্যুত হয়ে পরিবার নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছে। 

এ কারণে জানাজার আগে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের পরিবার-পরিজনের পক্ষে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল উপস্থিত সকলের উদ্দেশে বলেন, অন্যায়ভাবে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের ছেলেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এই ক্ষোভ থেকেই তিনি এই চিঠিটি লিখে গেছেন। আমরা তার লিখে যাওয়া চিঠির ওসিয়ত অনুয়ায়ী দাফনকার্য শেষ করতে চাই। এ সময় চিকিৎসার জন্য তিনি অনেকের কাছেই ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন।

একইভাবে গার্ড অব অনার প্রদান করতে যাওয়া ম্যাজিস্ট্রেটকে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের ছেলেরা জানান, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় জেলা প্রশাসক বেতন পান। তিনি জেলার পিতা। তার সঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধা দেখা করতে গিয়েও দেখা পান না। এর চেয়ে লজ্জার কি হতে পারে। এই কারণেই তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রত্যাখান করেছেন।

এ দিকে, জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম জানান, তিনি এ বিষয়ের কিছুই জানতেন না। মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রশাসন থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করতে যাওয়ার পরেই তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করতে না দেওয়ায় তা সম্ভব হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

উল্লেখ্য, চিঠিটিতে নিজে স্বাক্ষর করে গত ২২ অক্টোবর ডাকযোগে জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের বরাবরে প্রেরণ করেন তিনি। এর পরদিন ২৩ অক্টোবর সকাল ১১টার সময় হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।