হোম আলাপচারিতা ভারত কিভাবে জম্মু ও কাশ্মীরে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনছে

ভারত কিভাবে জম্মু ও কাশ্মীরে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনছে

59
0
ভারত কিভাবে জম্মু ও কাশ্মীরে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনছে
ছবি: সংগৃহীত

হাসান রফিক: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার জম্মু ও কাশ্মীরের আংশিক স্বায়ত্বশাসন ও রাষ্ট্রস্বত্তা ভেঙে দু’টো ফেডারেল অঞ্চলের আওতাভূক্ত করেন ৫ আগস্ট, ২০১৯ সালে। তিনি সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপসাধন করেন যার মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীরে তাদের নিজস্ব সংবিধান ছিল এবং তারা প্রতিরক্ষা, বর্হিদেশীয় যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারতেন। অনেকে এ ধারাটি বাতিলের বিপক্ষে সমালোচনা করলেও তাদের কোন পরিস্কার ধারণা নেই যে জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখ ইউনিয়ন টেরিটোরিতে সংবিধানের ৩৭০ ধারাটি বাতিল করলে কী প্রতিক্রিয়া হবে।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে সেখানে তেমন কোনো পরিবর্তণ নতুন সৃষ্ট ইউনিয়ন টেরিটোরিতে স্থানীয়রা দেখতে পাচ্ছেন না। যদিও রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে এবং ফারুক আব্দুল্লাহ, তাঁর ছেলে ওমর আব্দুল্লাহ ও প্রাক্তন সিএম মেহবুবা মুফতিকে গৃহে অন্তরীণ করা হয়েছে তবুও রাস্তাগুলোতে তাঁদের মুক্তির জন্য কোন আন্দোলন করতে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। যাঁরা নিজেদেও জনপ্রতিনিধি বলে প্রচার করতেন কার্যতঃ তাদের পেছনে কোন জনসমর্থন নেই।

যেভাবে জনজীবন স্বাভাবিক করার পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে

বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত জম্মু ও কাশ্মিরের পার্বত্য এলাকাগুলোতে সরকার বিশেষ বর্ধিত তহবিল অনুমোদন করেছে। সরকার বিশেষ আইন করে টু-জি ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা ইউনিয়ন টেরিটোরির ২০টি জেলায় বাতিল করে দেয় যা ৫ আগস্ট পর্যন্ত চালু ছিল। ২৫ জানুয়ারিতে তা আবার সংযোগ দেয়া হয়েছে।

৩৭০ ধারা বাতিল করে দেয়ার পর সরকার একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ নিয়ে সেখানে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করে। যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয় তার মধ্যে জম্মু ও কাশ্মিরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো আবার খুলে দেয়ার আদেশ জারী করা হয়। দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞদের দ্বারা স্বাস্থ্য সেবার পদক্ষেপ নেয়া হয়, সপ্তাহের ৭ দিনই বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, চিকিৎসা পাবার ব্যবস্থা করা হয়। আগস্টের ৫ তারিখ থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার রোগি বিভিন্ন অসুখে চিকিৎসার জন্য এসেছে, ৩৫ হাজার রোগিকে ভর্তি করা হয়েছে এবং ১১ হাজার রোগিকে অস্ত্রপচার করা হয়েছে। এ সব কিছু অর্জিত হয়েছে এই সময়ের ভেতর যখন ইর্ষামূলক প্রচারনা চলছিল যে সেখানে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের এবং শিশুখাদের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, জম্মু ও কাশ্মিরের ৯২ ভাগ এলাকায় কোনো বিধিনিষেধ নেই এবং জম্মু, কাশ্মির ও লাদাখে মাত্র ১১টি থানায় দিনের বেলা অংশিক বিধিনিষেধ রয়েছে মাত্র। ব্যাংক ও এটিএম বুথগুলোতে নিয়মিত টাকা সরবরাহ করা হচ্ছে যাতে জনগণের অসুবিধা না হয়। রান্নার গ্যাসের কোন ঘাটতি নেই, সরকারি দপ্তরগুলো এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিকবাবে কাজ চলছে।

জম্মু ও কাশ্মিরের ৭ লক্ষ কৃষকের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্ম চলছে এবং তারা ২.২ মেট্রিক টন আপেল উৎপন্ন করেছে। সরকার তাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা দানের জন্য কাজ করছে এবং উৎপাদিত পণ্য ক্রয়ের লক্ষ্যে ৮শত মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যা দিয়ে তাদের উৎপাদিত পণ্যের শতকরা ৫০ ভাগ ক্রয় করা যাবে। এ অর্থে কৃষকদের নিত্যনৈমিত্তিক দ্রব্য কেনার সহযোগিতা করা হবে। তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য সরকার ৫০,০০০ কর্মখালি পদ বের করেছে যার মাধ্যমে জম্মু, কাশ্মির ও লাদাখের তরুনদের কর্মের সুযোগকে গতিবেগ দেবে। অল্প কয়েক মাসে এ পদগুলোতে নিয়োগ দেয়া হবে।

২৪ আক্টোবর, ২০১৯ সালে ব্লক উন্ন্য়ন কাউন্সিলগুলোতে (পঞ্চায়েত রাজ ইন্সটিটিউশন, স্তর-২) অত্যন্ত সফলভাবে নির্বাচন হয়ে গেল যেখানে ৯৮% ভাগ ভোট পড়ে। স্থানীয় পর্যায়ে বর্ধিত জাতীয় আইনসভায় শতকরা ৩০ ভাগ পদ নারীদেও জন্য সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ১০৬টি জাতীয় আইন প্রণয়ন পদকে দুই ইউনিয়ন টেরিটোরির জন্য নতুনভাবে ২০০ পদবিশিষ্ট করা হয়। এসব পদাধিকারীরা সমাজের সুরক্ষা করবেন এবং সেখানে উন্নয়ন ঘটাবেন, নারীদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষায়, শিশুদের ও অবহেলিত শ্রেনিদের উন্নয়নে কাজ করবেন। তারা যোগাযোগ ও যৌক্তিক প্রশাসনব্যবস্থা কায়েম করবেন।

অশান্ত অবস্থা নিয়ে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক ঘটনা বানাচ্ছে
গত ১৫ জানুয়ারি চীনের সহযোগিতায় পাকিস্তান নতুনভাবে কাশ্মিরকে নিয়ে “অন্যান্য বিষয়”-এর তালিকায় আবারো নিরাপত্তা কাউন্সিলের আলোচনা হলে বিষয়টি উপস্থাপন করে। নিরাপত্তা কাউন্সিলের অধিকাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করে যে বিষয়টি সেখানে আলোচিত হবার মঞ্চ নয় বরং পাকিস্তান ও ভারত দ্বিপাক্ষিকভাবে আলোচনা করতে পারে। গতবছর আগস্টে এ কাউন্সিলে বিষয়টি নিয়ে আরো একবার বৈঠক বসে এবং সেটিও চীন কর্তৃক আহুত হয়। এ সময় ভারত কয়েক দশকের স্বায়ত্বশাসনের উচ্ছেদ ঘটিয়ে ভারতের সংবিধানের আওতায় আনে। সে সময়ও জাতিসংঘ পাকিস্তানের পক্ষে মীমাংসা করতে আপত্তি করেছিল। এমনকি এর আগের কোন এক ঘটনায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ অক্টোবর যখন ভারত সফর করবেন, তার ঠিক এক দিন আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ফোনে তাঁর স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নেন। যে কেউই অনুমান করতে পারেন, কেন তিনি ফোন করেছিলেন।

ভারত পাকিস্তান কর্তৃক আহুত একটি প্রস্তাব বাতিল করে দেয় যেখানে বিশে^র বহুজাতিক কিছু দর্শক জম্মু ও কাশ্মিরে যেতে চেয়েছিল। পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কাশ্মিরের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরাম, ডাভোসে গত ২২ জানুয়ারিতে তুলতে চেয়েছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে একটি ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি করবে, এই আশংকা সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক শক্তিশালী পক্ষগুলো যেমন জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করে সেখানে অনুপ্রবেশ করতে চেয়েছিল। দেখা গিয়েছে পাকিস্তান একটি নাটকের সৃষ্টি করে বিশ^বাসীকে বলতে চেয়েছিল যে দুই পারমাণবিক পরাশক্তির মাঝে একটি অশান্তির আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ^বাসী পাকিস্তানের এই অসৎ ইচ্ছা দুইভাবে দেখেছিল। একদিকে সে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে এবং একইসাথে ভারত ও অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসবাদে মদদ দিচ্ছে।

পাকিস্তানে যে অর্থনৈতিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে তা নিরসনের চেয়ে সে ডাভোস শীর্ষ সম্মেলনে কাশ্মিরের সমস্যাটি নিয়েই বেশি লাফালাফি শুরু করে। সীমান্ত এলাকায় ক্রমাগত সন্ত্রাসবাদীদের কাশ্মিরে মদদ দেয়ার পাকিস্তানী অভিসন্ধিকে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থা উদ্ঘাটন করে। জম্মু ও কাশ্মির ইউনিয়ন টেরিটোরিতে শান্তি বজায় রাখার পথে বাধা হিসেবে জাইস-ই-মোহাম্মদ ও হরকাতুল মুজাহেদিন যে অশান্তির সৃষ্টি করছে তা নসাৎ করে দেয়।
ভারত দৃঢ়তার সাথে গত সাড়ে তিন দশক ধরে চলে আসা সমস্ত সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। গত ৯ জানুয়ারি, ১৫ জন আবাসিক দুতাবাসের প্রধান দুই দিনের জন্য জম্মু ও কাশ্মিরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে আসেন। এদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ফিজি, মালদ্বীপ, নরওয়ে, ফিলিপাইন, মরক্কো, আর্জেন্টিনা, পেরু, নাইজার, নাইজেরিয়া, গুয়েনা ও টগোর পরিদর্শক। এর আগে ২৮ অক্টোবর থেকে পহেলা নভেম্বর পর্যন্ত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা সেখানে যান। এ দুটো সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল, সংবিধানের ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার পর এ অঞ্চলটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভারত কী পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং এই পদক্ষেপ কিভাবে আগাচ্ছে।

লেখক: বিশিষ্ট কলামিস্ট