হোম জাতীয় বুলবুল তাণ্ডব : সরকারি হিসাবে ১২ জনের মৃত্যু

বুলবুল তাণ্ডব : সরকারি হিসাবে ১২ জনের মৃত্যু

62
বুলবুল তাণ্ডব : সরকারি হিসাবে ১২ জনের মৃত্যু

বিটিএন২৪ রিপোর্ট: ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডব বাংলাদেশে বড় ধরনের আঘাত না আনলেও প্রচণ্ড ঝড়ে এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ১২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। ১২ জনের মধ্যে ১১ জন ঝড়ে গাছচাপা পড়ে এবং একজন আশ্রয়কেন্দ্রে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।     

সোমবার (১১ নভেম্বর) সরকারি হিসাবের বরাত দিয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন। 

তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ১২ জন মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে দুইজন শনিবার (০৯ নভেম্বর) এবং বাকি ১০ জন রবিবার (১০ নভেম্বর) মারা গেছেন। 

মারা যাওয়াদের পরিচয় হলো- বরিশালের উজিরপুরের আশা লতা মজুমদার (৬৫), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের হামিদ কাজী (৬৫), পিরোজপুরের নাজিরপুরের মনি মণ্ডল (৫৫), খুলনার দীঘলিয়ার আলমগীর (৪০), দাকোপের প্রমিলা মণ্ডল (৫২), বাগেরহাটের ফকিরহাটে হীরা বেগম (২৫), রামপালের সামিয়া (১৫), শরীয়তপুরের নরিয়ার আলীবক্স (৭০), ডামুড্ডার আলেয়া বেগম (৫০), গোপালগঞ্জ সদরের মতি বেগম (৬৫) ও কোটালীপাড়ার হাওলাদার (৭০) গাছচাপা পড়ে এবং বরগুনা সদরের হালিমা খাতুন (৭০) আশ্রয়কেন্দ্রে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। 

আহতের তথ্যের বিষয়ে এনায়েত হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে দেশের খুলনা, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগের ১০টি জেলার ১৭টি উপজেলায় মোট ৪৮ জন আহত হয়েছেন। সোমবার সকাল পর্যন্ত এসব এলাকার হাসপাতালগুলোতে গুরুতর অবস্থায় মোট ২৩ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ছয়জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে ফিরে গেছেন।  

এছাড়া ঝড়ের সময় পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ আশ্রয়কেন্দ্রে এবং বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার মিঠেখালি আশ্রয় কেন্দ্রে দু’টি শিশু জন্মগ্রহণ করেছে বলেও জানান তিনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র দিন জন্মগ্রহণ করা শিশুটির নাম রাখা হয়েছে ঝড়ের নাম অনুসারে ‘বুলবুলি’। মা ও শিশু দুটি স্বাস্থ্যকর্মীদের তত্ত্বাবধানে সুস্থ আছে।  

তাছাড়া ঘূর্ণিঝড় চলাকালীন সময়ে দুর্যোগপ্রবণ ১০টি জেলার ১০৮টি উপজেলায় এক হাজার ৬৩ ইউনিয়নে এক হাজার ৪৮৪টি মেডিক্যাল টিম কাজ করে। আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার ৫৮৭টি। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে ২০ লাখ ৬৬ হাজার ৮০৩ জন আশ্রয় নিয়েছিলেন। মেডিক্যাল টিমগুলো মেডিক্যাল অফিসার, সহকারী সার্জন, সিনিয়র স্টাফ নার্স, মিডওয়াইফ উপ-সহকারী, কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার, স্বাস্থ্য সহকারী সিএইচসিপি ও অন্যান্য কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে। 

তবে সারাদেশে দৈনিক অধিকার ও অন্যান্য গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে মৃত্যুর সংখ্যা ১৪ জন। এর মধ্যে খুলনায় ২ জন, বাগেরহাটে ২ জন, পটুয়াখালী ১ জন, পিরোজপুরে ১ জন, মাদারীপুরে ১ জন, ভোলায় ১ জন, সাতক্ষীরায় ১ জন, শরীয়তপুরে ১ জন, বরিশালে ১ জন, গোপালগঞ্জে ১ জন বরগুনায় ২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। 

সাতক্ষীরা : বুলবলের তাণ্ডবের পর সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় আবুল কালাম (৬০) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

শ্যামনগর থানার ইউএনও জানান, আবুল কালাম শেল্টার হোম থেকে উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা গ্রামে নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন। পথে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান।

মাদারীপুর : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটমাঝি গ্রামে ঘরের ওপর গাছ পড়ে সালেহা বেগম (৪০) নামে এক নারী মারা গেছেন। রবিবার বেলা ৩টার দিকে বসত ঘরের ওপর গাছ পড়ে ঘরের ভিতর আলমারির নিচে চাপা পড়ে তিনি মারা যান।

খুলনা : প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে খুলনার দিঘলিয়া ও দাকোপে গাছের নীচে চাপা পড়ে নারীসহ দুজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- প্রমিলা মণ্ডল (৫২) ও আলমগীর হোসেন (৩৫)।

এদিকে বুলবুলের আঘাতে কয়রা উপজেলায় দেড় হাজার ঘরবাড়ি এবং দাকোপ উপজেলায় ১৭০০ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।

পিরোজপুর : পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মালিখালী ইউনিয়নের লড়া গ্রামে ঘরের উপর গাছ চাপা পড়ে ননী গোপাল মণ্ডল (৬৫) নামে এক বৃদ্ধ মারা যান। রবিবার দুপুরে তিনি মারা যান। এ সময় গুরুতর আহত হয় একই পরিবারের সুমী (৮) ও নাসির (১৬) নামে দুই শিশু। ওই উপজেলার ৯ নম্বর কলারদোয়ানিয়া ইউপি চেয়ারম্যান হাসানাত ডালিম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এছাড়া রাজৈর উপজেলায় গাছে নিচে পড়ে ৬ জন আহত হয়েছে। অন্য দিকে চৌহদ্দি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ক্লাসরুম ভেঙে গেছে।

পটুয়াখালী : পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় হামেদ ফকির (৬৫) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছে। পেশায় তিনি ছিলেন একজন মৎস্যজীবী। শনিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে মির্জাগঞ্জ উপজেলার মাধবখালী ইউনিয়নের উত্তর রামপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সরোয়ার হোসেন জানান।

ভোলা : ভোলায় ঘূর্ণিঝড়ে ট্রলার ডুবে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় এখনো ১০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ভোলা পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার জানান, ইলিশা এলাকার মেঘনা নদীতে ২৪ জন জেলে নিয়ে একটি ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১০ জন জেলে জীবিত উদ্ধার ও ১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১৩ জন জেলে।

বুলবুলের প্রভাবে রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত গোটা জেলায় ভারী বৃষ্টি এবং ঝড়ো বাতাস বইছিল। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অসংখ্য গাছপালা ভেঙে পড়েছে। উপড়ে গেছে বিদ্যুতের খুঁটি। বেশ কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। অন্য দিকে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অতি বৃষ্টির কারণে ভোলার সদরের ইলিশা ব্রিকস, রিয়াদ ব্রিকস, মায়ের দোয়া ব্রিকস, সাবাব ব্রিকসসহ ৬৩টি ফিল্ডের কয়েক লাখ কাঁচা ইট গলে গিয়ে কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।

শরীয়তপুর : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় ঘরের উপর গাছ পড়ে মো. আলী বক্স ছৈয়াল (৭০) নামের এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছে। রবিবার বিকালে নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নের দেওজড়ি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে নড়িয়া থানার ওসি হাফিজুদ্দিন জানিয়েছেন।

বরিশাল : রবিবার বিকাল ৩টার দিকে বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুলের’ আঘাতে ঘরচাপা পড়ে আশালতা মজুমদার (৬৫) নামে এক বৃদ্ধা মারা যান। উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা আক্তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বৃদ্ধা আশালতা উজিরপুর পৌর এলাকার এক নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ মাদারসী এলাকার বাসিন্দা।

গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে গাছ চাপা পড়ে সেকেল হাওলাদার (৭০) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। রবিবার দুপুরে ঝড়ের সময় উপজেলার বান্ধাবাড়ি গ্রামের মৃত হাসান উদ্দিন হাওলাদারের ছেলে সেকেল হাওলাদার গাছচাপা পড়ে মারা যান।

এছাড়া শতাধিক ঘরবাড়ি, পোল্ট্রি সেট বিধ্বস্ত হয়েছে। হাজার হাজার গাছপালা উপড়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেছে। মৌসুমী ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সড়কের পাশের গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

বরগুনা ও বামনা : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে বরগুনা সদর ও বামনা উপজেলায় দুইজন মারা গেছেন। বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনিচুর রহমান জানান, বরগুনা সদর উপজেলার ৯ নম্বর এম বালীয়াতলী এলাকার ডিএন কলেজ আশ্রয়কেন্দ্রে হালিমা খাতুন (৬৬) নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি সদর উপজেলার বানাই গ্রামে। হালিমা খাতুন নামের ওই নারী অসুস্থতার কারণে মারা গেছেন বলে তিনি জানান।

এছাড়া বামনা উপজেলার উত্তর কাকচিড়া গ্রামে ঝড়ের আতঙ্কে শিশীর বিশ্বাস (২৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। ঝড়ের সময় ছুটাছুটি করতে গিয়ে আহত হয়েছে প্রায় অর্ধ শতাধিক লোকজন।