fbpx
হোম আলাপচারিতা ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ

ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ

8
ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ

মুনির আহমেদ

বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত ও সমভাবে বিতর্কিত একটি মতবাদ হচ্ছে সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। ধর্মনিরপেক্ষতার মূল ধারণা প্রাচীন হলেও মতাদর্শ হিসেবে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় আঠারো শতকে, ইউরোপে। এর সংজ্ঞা ও বাস্তব প্রয়োগের ব্যাপ্তি নিয়ে কিছুটা মতানৈক্য রয়েছে। তবে সকল ধর্মনিরপেক্ষ তাত্ত্বিক একমত যে, ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে এমন এক মতবাদ, যেখানে রাষ্ট্র থাকবে ধর্মের প্রভাব মুক্ত। রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতিতে ধর্মের প্রবেশাধিকার হবে নিষিদ্ধ।

ক্যামব্রিজ ডিকশনারিতে সেক্যুলারিজমের সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে এভাবে—Secularism definition: the belief that religion should not be involved with the ordinary social and political activities of a country. অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা : দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে ধর্ম জড়িত হওয়া উচিত নয় এমন বিশ্বাস।[১]

ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ‘ইহজাগিতিকতার প্রশ্ন’ প্রবন্ধে বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, এই কথাটা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর পরই খুব জোরেসোরে বলা হচ্ছে। কথাটা সত্য বটে আবার মিথ্যাও বটে। সত্য এ দিক থেকে যে, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা নাগরিকদের এ পরামর্শ দেয় না যে, তোমাদের ধর্মহীন হতে হবে; কিন্তু তা বলে এমন কথাও বলে না যে, রাষ্ট্র নিজেই সকল ধর্মের চর্চা করবে, কিংবা নাগরিকদের নিজ নিজ ধর্ম চর্চায় উৎসাহিত করবে। রাষ্ট্র বরঞ্চ বলবে ধর্মচর্চার ব্যাপারে রাষ্ট্রের নিজের কোন আগ্রহ নেই, রাষ্ট্র নিজে একটি ধর্মহীন প্রতিষ্ঠান। ধর্ম বিশ্বাস নাগরিকদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। রাষ্ট্রের ওই ধর্মহীনতাকেই কিছুটা নম্রভাবে বলা হয় ধর্মনিরপেক্ষতা।’[২]

এছাড়া আমেরিকান হেরিটেজ ডিকশনারিতে Secularism শব্দটির সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে এভাবে—The view that religious considerations should be excluded from civil affairs or public education. অর্থাৎ নাগরিক বিষয় বা পাবলিক শিক্ষা থেকে ধর্মীয় বিবেচনা বাদ দেওয়া উচিত, এই ধারণা।’[৩]

এসকল সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট হয়, ধর্মকে রাষ্ট্রের কাজের সাথে জড়ানো যাবে না- এটাই সেক্যুলারিজমের মূল কথা। ধর্ম যদিও থাকতে পারে, তবে তা থাকবে জনগণের একান্ত ব্যক্তিগত পরিমন্ডলে—‘প্রাইভেট’ ব্যাপার হিসেবে; ‘পাবলিক’ ব্যাপার-স্যাপারে তাকে জড়ানো যাবে না।

সেক্যুলারিজমের উৎপত্তি
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী একটি মতাদর্শকে ভুল প্রমাণ করতে আরেকটি মতবাদ জন্মলাভ করে। সেক্যুলারিজমের ক্ষেত্রেও বিষয়টির ব্যতিক্রম ঘটেনি। সেক্যুলারিজমের মূল কথা হলো, বর্তমান সময়ের সমস্যার সমাধানে ধর্ম অপারগ ও অচল। তাই কল্যাণ ও প্রগতির জন্য ধর্মের স্থানে অধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেক্যুলারিজমকে বোঝার জন্য এর উৎপত্তির ইতিহাস জানা জরুরি।

বর্তমান সেক্যুলারিজম মতবাদ হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে মধ্যযুগে ইউরোপে। খ্রিস্টীয় পনেরো শতাব্দি থেকে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। তখনকার ইউরোপীয় সমাজে গীর্জা ও তার পাদ্রীদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। পাদ্রীরা নিজেদের কথাকে ধর্মের প্রলেপ লাগিয়ে প্রচার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতো। বিজ্ঞানীদের গবেষণামূলক মত পাদ্রীদের অসার উক্তিগুলোকে ক্রমাগত ভুল প্রমাণ করে। এরফলে বিজ্ঞানীদের সাথে পাদ্রীদের মতবিরোধ ক্রমশ বাড়তে থাকে। পাদ্রীরা নিজেদের ইমেজ ধরে রাখার জন্য অনোন্যপায় হয়ে ধর্মের দোহায় দেয়া শুরু করে। অবস্থা বেগতিক দেখে একপর্যায়ে গির্জাগুলো সরাসরি বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, গির্জা কর্তৃক Inquisition কোর্ট গঠন করা হয় এবং বিজ্ঞানীদেরকে ধর্মদ্রোহী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।

বিজ্ঞানী কোপার্নিকাস (Copernicus) ১৫৪৩ সালে ‘আকাশে গ্রহ নক্ষত্রের আবর্তন’ নামক একটি বই প্রকাশ করেন। গির্জা কর্তৃক বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। 
খ্যাতিমান বিজ্ঞানী গ্যালিলিও (Galileo) টেলিস্কোপ আবিস্কার করার কারণে ৭০ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানীর ওপর কঠোর নির্যাতন নেমে আসে। ১৬৪২ সালে তিনি মারা যান।

বিজ্ঞানী স্পিনোজা (Spinoza) ছিলেন ইতিহাস সমালোচনার প্রবক্তা। তাঁর শেষ পরিণতি হয়েছিল তরবারির আঘাতে মৃত্যুদণ্ড।

এভাবে অনেক বিজ্ঞানীদের উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন ও চরম দন্ড। এর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় যা হবার তাই হল। চিন্তক ও গবেষকদের উপর নির্যাতনের প্রতিক্রিয়ায় বিজ্ঞানী ও চিন্তাশীলদের মধ্যে বিদ্রোহ দানা বাঁধে। পাদ্রীদের নিজস্ব-মনগড়া মতামতের ভ্রান্তি যতই প্রমাণিত হয় বিদ্রোহীদের শক্তি ও মনোবল ততই বৃদ্ধি পায়। ধর্মের নামে পাদ্রীদের এই অধার্মিক আচরণ বিদ্রোহীদের মনে প্রবল ধর্মবিদ্বেষ সৃষ্টি করে। তারা ধর্মকে সকল অমঙ্গলের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বিদ্রোহীরা সিদ্ধান্ত নেয় সমাজজীবনের সকল স্তর থেকে ধর্মকে বিতাড়িত করবে। পাদ্রীরাও রাজশক্তি ও ধর্মান্ধ জনতাকে সাথে নিয়ে বিদ্রোহীদের দমন করা শুরু করে। বিদ্রোহীদের সাথে এ সংঘাত দু’শ বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। যা রাষ্ট্র বনাম গির্জার সংঘাত নামে পরিচিত।[৪]

দীর্ঘ সংঘাতের একপর্যায়ে একদল সংস্কারবাদীর আবির্ভাব ঘটে। তারা উভয়পক্ষকে একটি সিদ্ধান্তে আনতে সক্ষম হন। তা হলো, ‘ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকুক এবং মানুষের ধর্মীয় কিছু আচার-অনুষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার ক্ষমতা চার্চের হাতে থাকুক। কিন্তু সমাজের পার্থিব জীবনের সকল দিকের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের হাতে থাকবে এবং পার্থিব কোন বিষয়েই চার্চের কোন কর্তৃত্ব থাকবে না। অবশ্য রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দকে ক্ষমতা নেবার সময় চার্চের নিকট রাষ্ট্র পরিচালনার রাষ্ট্র পরিচালনার শপথ গ্রহণ করতে হবে।’

কোণঠাসা হয়ে যাওয়া পাদ্রীরা কেবল গির্জার কর্তৃত্ব পেয়েই প্রস্তাব মেনে নেয়। আর বিদ্রোহীরাও রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতি থেকে ধর্মকে বিতাড়িত করতে পেরে সানন্দে প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি হয়। মূল কথা দাঁড়ায় ব্যক্তি মসজিদে যাবে নাকি গির্জায় যাবে নাকি কোথাও যাবে না এটা তার একান্ত ঐচ্ছিক ব্যাপার। রাষ্ট্র এখানে নাক গলাবে না। তবে রাষ্ট্রের সংবিধানে ধর্মের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ থাকবে। সেক্যুলারিজমের প্রধান আদর্শিক প্রতিপক্ষ যেহেতু ধর্ম তাই সেক্যুলার রাষ্ট্রকে জনগণের একান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিমণ্ডলেও ধর্ম পালনে ব্যাঘাত ঘটানোর প্রয়াস চালাতে দেখা যায়।

সেক্যুলারিজমের অসারতা
যে অঞ্চলে ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের সূচনা হয় সেখানকার জীবনব্যবস্থার সকল ক্ষেত্রে কেবল খ্রিস্টান পাদ্রীদের প্রভাব ছিল। পাদ্রীদের কাছে থাকা ধর্মগ্রন্থ যে বিকৃত এবং বর্তমান সময়ের জন্য প্রযোজ্য নয়, তা আল্লাহ তায়ালা খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দিতেই জানিয়ে দিয়েছেন তাঁর প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত বার্তাবাহক মুহাম্মদ সা. এর মাধ্যমে।

সেক্যুলার আন্দোলনকারীদের আন্দোলনের ধরণ হয়েছে অনেকটা এরকম, পাদ্রীরা যেহেতু আল্লাহর বিধানের নামে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তাই আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিতে হবে। অনেকটা মাথা ব্যাথা হলে মাথা কেটে ফেলার সিদ্ধান্তের মতো। যদিও যুক্তির দাবি ছিল যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা ধর্ম প্রচার করে তাদের বর্জন করা আর যারা আল্লাহর সঠিক দীন‌ প্রচার করছে তাদের সমর্থন করা ও সঠিক দীন মেনে নেয়া। সেক্যুলাররা তা না করে আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে যাবার মতো চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয়। তারা মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেয়। আল্লাহর থেকে নিজেদের অমুখাপেক্ষি দাবি করে। এজন্য জাতীয় সংবিধান রচনার দায়িত্ব এসে পড়ে গুটি কয়েক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর উপর। যাদের না আছে ভবিষ্যতের ভালো-মন্দ সম্পর্কে জ্ঞান আর না আছে কোন নির্ভুল মানদণ্ড। যার সাহায্যে কোন সঠিক ও উপযুক্ত সিদ্ধান্তে স্থির হতে পারবে। আর যারা আইন রচনা করবে সে আইন তাদের উপরও প্রযোজ্য হবে। কোন মানুষকে যদি নিজের আইন নিজেকেই তৈরি করতে বলা হয় স্বাভাবিকভাবেই সে তার নিজের স্বার্থের প্রতি বিশেষ নজর দিবে। তাই আমরা দেখতে পাই আল্লাহর দেয়া অর্থব্যবস্থা গ্রহণ না করে নিজেদের গড়া পূঁজিবাদের মাধ্যমে বিশ্বের সমুদয় অর্থ গুটিকয়েক মানুষের হাতে জিম্মি করে ফেলেছে এই সেক্যুলার গোষ্ঠী। সেক্যুলার ব্যবস্থায় কখনোই নিরপেক্ষতা দেখা যায় না, এখানে বিশেষ সুবিধা বরাবরই বিশেষ কোনো গোষ্ঠীকে পেতে দেখা যায়। এভাবে কখনোই গণমানুষের সামগ্রিক কল্যাণ সম্ভব হয় না। আর এ সমস্যার সমাধান একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই দিতে পারবেন। কেননা তিনিই শুধুমাত্র অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্যক অবগত। স্রষ্টাই যে তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো জানবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি তাঁর সৃষ্টির জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর ব্যবস্থা বাতলে দিতে পারবেন এটাই স্বাভাবিক ‌এবং তিনি কখনোই তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে জুলুম বা পক্ষপাত করবেন না। স্রষ্টা তাই অনুগ্রহ করে মানুষের জন্য কল্যাণের কিতাব ও নবী প্রেরণ করেছেন।

ধর্ম কেবলমাত্র ব্যক্তি জীবনে মানা যাবে সেক্যুলারদের এ দাবিও অযৌক্তিক এবং শুভঙ্করের ফাঁকি। মানুষ সামাজিক জীব। কিছু মানুষ নিয়ে পরিবার আবার কিছু পরিবার নিয়ে সমাজ গঠিত হয়। কোন মানুষ একান্ত ব্যক্তিগত জীবনে বা পরিবারে ধর্ম পালন করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাজেও ধর্ম পালন হবে। কারণ মানুষ সমাজেরই অংশ। একজন মানুষ ব্যক্তিজীবনে চরিত্রবান আর সমাজ জীবনে লম্পট এমন হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে কোন ব্যক্তি সমাজ জীবনে ধর্মবিরোধী আর ব্যক্তি জীবনে ধার্মিক হওয়া কিভাবে সম্ভব? সমাজজীবনে ধর্মীয় বিধানের বিলোপ ঘটালে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যক্তি জীবনে ধর্ম পালনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ব্যক্তিজীবন আর সমাজজীবনের কাল্পনিক ব্যবধানের সীমারেখাই বা কোথায়? যেখানে সীমারেখাই সম্ভব নয় সেখানে ব্যক্তি জীবনে ধর্ম পালনের সুযোগ দিয়ে সমাজ জীবনে নিষিদ্ধ করাতো হিপোক্রেসি ছাড়া কিছু নয়। তাই সেক্যুলারিস্টরা সমাজ থেকে ধর্ম বিলোপ করতে যেয়ে ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতাও হরণ করে। এভাবে তাদের দাবিতে তারাই অসৎ প্রমাণিত হয়।

সেক্যুলারিস্টদের দাবিগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তাদের অসারতাগুলো আরো স্পষ্ট হয়। তাদের অনেকেই বলে থাকে, আমরা ধর্ম বিরোধী নই, আমরাও ব্যক্তিজীবনে ধর্ম পালন করি! এ কথার মাধ্যমে তারা স্রষ্টাকে স্বীকার করে নেয় সাথে এও প্রমাণের চেষ্টা করে যে, তারা স্রষ্টার অবাধ্য নয় বরং অনুগত। তাহলে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়, যখন স্বীকার করা হলো সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা ও পরিচালক আছেন। স্রষ্টা মহাজগতের সকল কিছু সুনিপুণভাবে সৃষ্টি ও পরিচালনা করছেন। তাহলে কেন সেই সৃষ্টিকর্তার বিধান দিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, সমরনীতি, কূটনীতি, বিচারব্যবস্থা প্রভৃতি পরিচালনা করা হবে না? যদি সেক্যুলারিস্টদের পক্ষ থেকে বলা হয়, সে বিধান আমাদের জন্য উপযোগী নয়। তাহলে যিনি উপযোগী বিধান দিতে সক্ষম নন তার বিধান ব্যক্তিগত জীবনে আনুগত্যের অভিনয় করার হেতু কী? আর মহাজগতের স্রষ্টার নিয়মে সমগ্র সৃষ্টি জগৎ নিখুঁতভাবেই পরিচালিত হতে দেখার পরও মানব জীবনের সমস্যার সমাধান দিতে স্রষ্টাকে অক্ষম বলা পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছু নয়। এভাবেই পুরোপুরি অসার ও শঠতাপূর্ণ চিন্তার উপর সেক্যুলারিজম মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

সেক্যুলারিজম তথা মানুষের প্রবৃত্তি অনুযায়ী রচিত বিধান যে ভুল হবে বা হতে পারে তা স্বয়ং সেক্যুলার রাজনীতিবিদরাও স্বীকার করে। তার প্রমাণ হচ্ছে সকল সেক্যুলার রাষ্ট্রের সংবিধান পরিবর্তনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তারা আইন রচনা করে প্রয়োগের পর যখন দেখে এই আইন শান্তি শৃঙ্খলা বা ন্যায়বিচার ব্যাহত করছে তখন আবার নতুন আইন তৈরি করে। এভাবে ভ্রান্ত আইন ও ভুল দর্শনের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকে সেকুলার রাষ্ট্রের জনগণ। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আইন তৈরি করে মানবজাতির উপর গিনিপিগের মত পরীক্ষা চালায়।

ইসলামের দৃষ্টিতে সেক্যুলারিজম
ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। আল্লাহ তায়ালার মনোনীত দ্বীন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَ مَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡہُ ۚ وَ ہُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ ﴿۸۵﴾

‘যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দীন তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত।’ [সুরা আলি ইমরান, ৩ : ৮৫]

এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ব্যক্ত করেছেন যে, ইসলামের বিপরীত অন্য কোন ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা কেউ গ্রহণ করলে তা আল্লাহর কাছে প্রত্যাখ্যাত এবং তারা আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া ইসলাম কোয়ালিটি ও কোয়ান্টিটি উভয় দিক থেকে পরিপূর্ণ। তাই এখানে নতুন করে সংযোজন ও বিয়োজনের কোন সুযোগ নেই। প্রয়োজন নেই অন্য কোন মতবাদ গ্রহণের। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَی نِعۡمَتِیۡ وَ رَضِیۡتُ لَکُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا

‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ [সুরা আল মায়িদা, ৫ : ৩]

সুতরাং ইসলাম আল্লাহর মনোনীত ও পূর্ণাঙ্গ দ্বীন। তাই মুসলিমদের জন্য ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দীন গ্রহণের কোন সুযোগ নেই। হোক তা হিন্দুইজম বা সেক্যুলারিজম। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ کَآفَّۃً ۪ وَ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّہٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ [সুরা বাকারা, ২ : ২০৮] 

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, পুরোপুরি ইসলামের আনুগত্য প্রকাশ করতে হবে। মহান আল্লাহ তাঁর ওপরে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণকে ও তাঁর নবির সত্যতা স্বীকারকারীগণকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন তাঁর সমস্ত নির্দেশ মেনে চলে এবং সমস্ত নিষিদ্ধ বিষয় হতে বিরত থাকে ও পূর্ণ শরিয়তের ওপর আমল করে।[৫]

ইবনু আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, আহলে কিতাবরা ইসলাম গ্রহণের পরেও তাওরাতের কতগুলো নির্দেশ মেনে চলতো। তাদেরকেই বলা হচ্ছে দীনে মুহাম্মাদির মধ্যে পুরোপুরি এসে যাও। এর কোন আমলই পরিত্যাগ করো না। তাওরাতের ওপর শুধু ঈমান রাখাই যথেষ্ট। অতঃপর বলা হচ্ছে, ‘আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলো না, নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন,

﴿فَاِنْ زَلَلْتُمْ مِّنْۢ بَعْدِ مَاجَآءَتْكُمُ الْبَیِّنٰتُ فَاعْلَمُوْۤا اَنَّ اللّٰهَ عَزِیْزٌ حَكِیْمٌ﴾

‘প্রমাণ জেনে নেয়ার পরেও যদি তোমরা সত্য হতে সরে পড়ো তাহলে জেনে রেখো যে, মহান আল্লাহ প্রতিদান দেয়ার ব্যাপারে প্রবল পরাক্রান্ত।’ না তাঁর থেকে কেউ পলায়ন করতে পারবে, আর না তাঁর ওপর কেউ প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। তিনি তাঁর নির্দেশাবলী চালু করার ব্যাপারে মহা বিজ্ঞানময়। পাকড়াও করার কাজে তিনি মহাপরাক্রশালী এবং নির্দেশ জারি করার কাজে তিনি মহাপ্রজ্ঞাময়। তিনি কাফিরদের ওপর প্রভুত্ব বিস্তারকারী এবং তাদের ওজর ও প্রমাণ কর্তন করার ব্যাপারে তিনি নৈপুণ্যের অধিকারী।

এসকল আলোচনা থেকে বোঝা যায় ইসলামের বিপরীত কোন কিছুই গ্রহণ করার সুযোগ নেই। মুসলিম হতে হলে ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করতে হবে। ইসলামের কিছু অংশ গ্রহণ আর কিছু অংশ বর্জনের কোন সুযোগ ইসলামে নেই।[৬] আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট বলেছেন,

اَفَتُؤۡمِنُوۡنَ بِبَعۡضِ الۡکِتٰبِ وَ تَکۡفُرُوۡنَ بِبَعۡضٍ ۚ فَمَا جَزَآءُ مَنۡ یَّفۡعَلُ ذٰلِکَ مِنۡکُمۡ اِلَّا خِزۡیٌ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ یُرَدُّوۡنَ اِلٰۤی اَشَدِّ الۡعَذَابِ

‘তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আনো এবং কিছু অংশে কুফরি করো? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে।’ [সুরা বাকারা, ২ : ৮৫]

আর সেক্যুলারিজমের দর্শন অনুযায়ী রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি তথা জীবনের সকল দিক থেকে ইসলামকে বাদ দিতে হবে। যেখানে কুরআনের একটি বিধান মানতে অস্বীকৃতি জানালে সর্বসম্মতিক্রমে কোন ব্যক্তি মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যায়। সেখানে সেক্যুলার হতে হলে প্রায় গোটা ইসলামকেই ত্যাগ করতে হয়। বিধান সংক্রান্ত শত শত আয়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হয়। সেক্যুলারিজম যে ইসলাম বিরোধী এবং কুফর এতে কারও অস্পষ্টতা থাকার কথা নয়। সেক্যুলারদের দ্রোহ মূলত আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে। তাই এদের বলা উচিৎ আল্লাহদ্রোহী। 

তথ্যসূত্র
১. https://dictionary.cambridge.org/amp/english/secularism
২. ইহজাগতিকতার প্রশ্ন, স্বতন্ত্র ভাবনা (চারিদিক, ২০০৮)
৩. https://www.ahdictionary.com/word/search.html…
৪. http://www.iun.edu/~hisdcl/h113_2001/churchstate.htm
৫. তাফসির ইবনু আবি হাতিম, ২/৫৮৬-৫৮৮।
৬. তাফসির ইবনু কাসির, সুরা বাকারা ২০৮ নাম্বার আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।